fbpx
শিবগঞ্জ ডট কম

শিবগঞ্জের অহংকার বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশু মাস্টার

‘বিশু মাস্টার’ নামটা শুনলেই ভিতর থেকে কেমন যেন সন্মান চলে আসে। এলাকার সবার কাছে পরিচিত ছিল বিশু মাস্টার নামেই, পুরো নাম ছিল ফাইজুর রহমান। শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের হেরাশনগর (ঘোনটোলা) গ্রামে জন্ম শিবগঞ্জের এই কৃতি সন্তানের। নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন একজন ন্যায় ও নীতিবান আদর্শ ব্যক্তি।

হেরাশনগর (ঘোনটোলা) গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে তার রেখে যাওয়া অনেক স্মৃতি। ভালোবাসতেন শিবগঞ্জ উপজেলাকে, তাই শিবগঞ্জের উন্নয়ন সাধনের জন্য দৌড়ে বেড়িয়েছেন সব জায়গায়। মাতৃভূমির ভালোবাসায় ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। নিজ গ্রামের উন্নয়নে রেখে গেছেন অতুলনীয় ভূমিকা।

ব্যক্তিগত জীবন- ব্যক্তিগত জীবনে খুব সাদামাটা জীবনযাপন পছন্দ করতেন। তিনি ছিলেন খুব সরল মনের মানুষ। প্রচণ্ড ধৈর্যশীল ব্যক্তি হিসেবে বেশ নাম ছিল তাঁর। রাজনৈতিক, সামাজিক বা পারিবারিক জীবনে কখনও কোন সমস্যার সৃষ্টি হলে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য সহকারে তা সমাধান করতেন। সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করতেন তবে একটু রাগী ছিলেন বটে। রাগের বশবর্তী হয়ে কখনো কারও প্রতি অন্যায় আচরণ করেননি। বিশু মাস্টার অন্যায় একদম দেখতে পারতেন না, তাই অন্যায়ের ব্যাপারে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত কখনও অন্যায়ের কাছে মাথানত করেননি।

ধর্মীয় জীবন- ধর্মীয় ব্যাপারেও খুব আগ্রহী ছিলেন। জীবনের প্রথম দিকে একটু অনাগ্রহ থাকলেও পরবর্তীতে তিনি কোরআন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। নিয়মিত সকালে ফজরের নামাজ আদায়ের পরে কোরআন পড়তে পছন্দ করতেন তিনি। অর্থসহ কোরআন পাঠ করার পাশাপাশি সবসময় সবাইকে ধর্মের ব্যাপারে পরামর্শ দিতে পছন্দ করতেন।

শিক্ষকতা জীবন- ব্যক্তি জীবনে তিনি একজন সুশিক্ষক এবং পরবর্তীতে আদর্শবান প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষক হিসেবে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাকে অপছন্দ করতো এমন শিক্ষার্থী একজনও পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ছিলও প্রশংসনীয়। শিক্ষার্থীদের যেমন শাসন করতেন তেমনি আদর করতেন। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী টাকার অভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করতে চাইলেও তিনি নিজে তাঁদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শিবগঞ্জের অনেক স্কুল প্রতিষ্ঠায় তাঁর পত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে। তাঁর নিজ হাতে গড়া অগণিত ছাত্রছাত্রী তাঁরই আদর্শের সৈনিক। তিনি বিনোদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এছাড়াও তিনি আরও কয়েকটি বিদ্যালয়য়ের শিক্ষকতা করেন।

রাজনৈতিক জীবন- রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে তিনি বাম রাজনীতির সাথে জড়িত থাকলেও স্বাধীনতার প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আওয়ামী লীগ করে গেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি একজন নির্ভীক বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনেও তিনি বহু আদর্শবান রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। এই উত্তরবঙ্গের প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মরহুম জনাব ডা: মঈন উদ্দিন আহমেদ মহোদয় বিশু স্যারকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে সমীহ করতেন।

মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ- শিবগঞ্জ উপজেলার সরকারি ওয়েবসাইটে তাঁর যুদ্ধের অংশগ্রহণের একটি বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। তা সরাসরি দেয়া হলও।

শিবগঞ্জ পাকসেনা ক্যাম্প আক্রমন২৫শে আগস্ট ১৯৭১ সাল, ৮ই ভাদ্র ১৩৭৮ সন বাংলা। শিবগঞ্জে অবস্থিত পাক বাহিনী ক্যাম্প আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে বিনোদপুর থেকে ৫টি নৌকা যোগে ডাঃ মইন উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে শিবগঞ্জ অভিমুখে রওনা দেয়। সঙ্গে মোঃ ফাইজুর রহমান (বিশু মাস্টার)ও ছিলেন। ভবানীপুর গ্রামের ভিতর দিয়ে নদী থেকে বিলে উপচিয়ে পানি পড়া খাল বরাবর নৌকাযোগে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত স্রোতের কারণে নৌকা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একটি নৌকা আড়াআড়িভাবে পিঠালি গাছে ধাক্কা খেয়ে ভেঙ্গে যায় ও যোদ্ধারা অস্ত্রসহ ছিটকে পড়ে। পানিতে পড়া মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে এবং উদ্ধার করতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বন্যায় কুমিরাদহ বিলের থৈ থৈ পানিতে দিক নির্ণয় করা খুব কঠিন হয়ে যায় এবং দুর্লভপুর পৌঁছেতে সকাল হয়ে যায়। শিবগঞ্জের ক্যাম্প আক্রমণ করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দলে বিভক্ত হওয়ার কথাছিল। একদল তর্ত্তীপুর ঘাট থেকে ও অপর একটি দল কালুপুর উত্তর পাড়া জুম্মা মসজিদে পাশ দিয়ে সরাসরি ক্যাম্প আক্রমণ করার কথা এবং তৃতীয় দলটি ডাঃ মইন উদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে দুর্লভপুর হাই স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে মরহুম সুবেদার আনেশুর রহমানের নেতৃত্বে ৬র্ মর্টারসহ অন্যান্যভারী অস্ত্রের মাধ্যমে মূল ক্যাম্পে আক্রমণ পরিচালনা করা হয়। এছাড়া অন্য দুটি দলকে আলো প্রকাশিত হওয়াই দূর থেকে আক্রমণ করতে হয়েছিল। ঐ দুটি দলকে ফিরিয়ে আনার জন্যে ক্যাম্পের উপর মর্টারিং করা হয়। দীর্ঘক্ষণ ধরে এ আক্রমণ চালানো হয়। ঐ দু’টি দল সরাসরি পাক বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ না করে কালুপুরে অবস্থানকারী রাজাকারদের উপর আক্রমণ চালায়। পাকসেনা ও রাজাকারদের অনেক ক্ষয়-ক্ষতি করে মুক্তি যোদ্ধারা বিনোদপুর ফিরে যায়।

২০১০ সালের ১২ জুন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের দেলবলতলায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এখনো এলাকাবাসী তাঁর কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।


সম্পাদক
শিবগঞ্জ.কম

তথ্য কৃতজ্ঞতা- হাবিবুর রহমান চৌধুরী মজনু

Desk News

মন্তব্য দিন

লিখতে চান?

আপনি কি লিখালিখি করতে পছন্দ করেন? আপনি যদি শিবগঞ্জ বিষয়ে যে কোন কিছু লিখতে চান তবে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

Advertisement

Social Widget

Collaboratively harness market-driven processes whereas resource-leveling internal or "organic" sources.

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed